ডিজিটাল অ্যারেস্ট প্রতারণা: কীভাবে চিনবেন, আর কী করবেন
ফোনে কেউ বলছে, আপনার নামে পাঠানো পার্সেলে মাদক পাওয়া গেছে, বা আপনার আধার কালো টাকা সাদা করার কাজে জড়িত। তারপর এক “পুলিশ অফিসার” ঘণ্টার পর ঘণ্টা আপনাকে ভিডিও কলে আটকে রাখে আর “যাচাইয়ের জন্য” সঞ্চয়ের টাকা সরাতে বলে। এটাই ডিজিটাল অ্যারেস্ট প্রতারণা। প্রথম মিনিটেই কীভাবে চিনবেন, টাকা দিয়ে ফেললে কী করবেন, আর আইন ও আদালত কী বলে, সব এখানে।
চারটে তথ্য, যা শুনলেই কল কেটে দেবেন
- ভারতের আইনে ডিজিটাল অ্যারেস্ট বলে কিছু নেই। কোনো পুলিশ, CBI, কাস্টমস, ED, RBI বা আদালত ভিডিও কলে কাউকে গ্রেফতার করে না, বা ক্যামেরার সামনে “গ্রেফতার” করে রাখে না।
- কোনো অফিসার “যাচাইয়ের জন্য” টাকা সরাতে বলেন না। “নিরাপদ সরকারি অ্যাকাউন্ট” বলে কিছু নেই, আর “তদন্তের” পরে টাকা ফেরতও আসে না।
- পুলিশের হাজিরার নোটিস WhatsApp-এ আসে না। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, BNSS-এর ৩৫ ধারার নোটিস WhatsApp বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক উপায়ে দেওয়া যায় না।
- গোপনীয়তাই প্রতারণার মূল। আসল তদন্তে কখনও পরিবার বা আইনজীবীকে জানাতে নিষেধ করা হয় না। কাউকে জানানোর মুহূর্তেই চিত্রনাট্যটা ভেঙে পড়ে।
২০২৪-এর মে মাসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সতর্ক করেছিল যে প্রতারকেরা পুলিশ, CBI, মাদক দমন অফিসার, RBI আর ED সেজে ফোন করে। তারা বলে আপনার নামে মাদক বা জাল পাসপোর্ট ভরা পার্সেল পাঠানো হয়েছে, বা কোনো আত্মীয় হেফাজতে আছেন। টাকা না দেওয়া পর্যন্ত তারা ভুক্তভোগীকে Skype বা অন্য ভিডিও কলে আটকে রাখে, থানার মতো সাজানো স্টুডিও থেকে। মন্ত্রক বলছে, এই অপরাধ চালায় সীমান্তের ওপারের চক্র। চার অঙ্কের পুরো চিত্রনাট্য পড়ুন আধুনিক সাইবার প্রতারণার ব্যবচ্ছেদ গাইডে।
এটা কি ডিজিটাল অ্যারেস্ট? বিপদসংকেত যাচাই
যা যা ঘটেছে, সব টিক দিন। আপনি যা টিক দেবেন, তা আপনার ডিভাইসের বাইরে যায় না।
যদি এখনই ঘটছে
- কল কেটে দিন। তর্ক বা ব্যাখ্যা করবেন না। ফোন রাখতে কারও অনুমতি লাগে না।
- কোনো টাকা সরাবেন না। ডিপোজিট ভাঙবেন না, লোন নেবেন না, OTP, PIN বা কার্ড নম্বর দেবেন না।
- বিশ্বস্ত কাউকে জানান। এখনই পরিবারের কাউকে বা বন্ধুকে ফোন করুন।
- অভিযোগ করুন। ১৯৩০-এ ফোন করুন বা cybercrime.gov.in-এ অভিযোগ করুন। কলারের নম্বরটা সঞ্চার সাথীর (sancharsaathi.gov.in) Chakshu পাতায় জানান।
- সত্যিই কোনো মামলা আছে কি না ভয় পাচ্ছেন? কলারের দেওয়া নম্বরে নয়, নিজে খুঁজে নেওয়া নম্বরে আপনার স্থানীয় থানায় ফোন করুন।
যদি টাকা দিয়ে ফেলেছেন
- এখনই ১৯৩০-এ ফোন করুন। যত তাড়াতাড়ি জানাবেন, যে অ্যাকাউন্টে টাকা গেছে সেখানে তা আটকে দেওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি।
- আপনার ব্যাংককে জানান তাদের ২৪x৭ হেল্পলাইনে, ব্যাংকের .bank.in ওয়েবসাইট বা কার্ডে দেওয়া নম্বরে। আর কোনো টাকা কাটা বন্ধ করতে বলুন, আর অভিযোগ নম্বর নিন।
- cybercrime.gov.in-এ অভিযোগ করুন প্রতারকদের ব্যবহার করা প্রতিটা লেনদেন, অ্যাকাউন্ট, UPI ID আর ফোন নম্বর দিয়ে, আর কল ও মেসেজের স্ক্রিনশট রেখে দিন।
- পুলিশের কাছে যান। আমাদের সাইবার সেল ডিরেক্টরিতে অফিশিয়াল ইমেল আছে, আর অভিযোগপত্রও লিখে দেয়। প্রতিটা ধাপ বোঝানো আছে প্রতারণার পরের প্রথম ২৪ ঘণ্টা গাইডে।
২০২৭ থেকে ক্ষতিপূরণ
RBI-এর সংশোধিত নির্দেশ (RBI/2026-27/167) প্রযোজ্য ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে হওয়া লেনদেনে। এতে ব্যক্তিদের জন্য এককালীন ছোট অঙ্কের ক্ষতিপূরণ আছে: ₹৫০,০০০ পর্যন্ত ক্ষতির ৮৫%, সর্বোচ্চ ₹২৫,০০০, যদি প্রতারণার কথা পাঁচ ক্যালেন্ডার দিনের মধ্যে ব্যাংকে আর ১৯৩০ বা cybercrime.gov.in-এ জানানো হয়। নির্দেশে স্পষ্ট বলা আছে, জোর-জবরদস্তি বা হুমকির মুখে অনুমোদন করা পেমেন্টও এর আওতায়, যেমন ডিজিটাল অ্যারেস্ট। প্রকল্পটা ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে এক বছর পর্যন্ত হওয়া প্রতারণার জন্য, আর যোগ্যতা ঠিক করে আপনার ব্যাংক। তবু প্রতিটা ঘটনা জানান।
দ্বিতীয় প্রতারণা থেকে সাবধান। টাকা খোয়ানোর পরে ভুয়ো “আইনজীবী”, “সাইবার সেলের অফিসার” বা “রিকভারি এজেন্ট” ফোন করে টাকা উদ্ধারের জন্য ফি চাইতে পারে। আসল পুলিশ বা আদালত টাকা উদ্ধারের জন্য আপনার কাছে টাকা নেয় না।
আইন ও আদালত কী বলে
- নোটিস ঠিক নিয়মে দিতে হবে। Satender Kumar Antil v. CBI মামলায় ২১ জানুয়ারি ২০২৫ সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয় যে BNSS-এর ৩৫ ধারার (পুরনো CrPC-র ৪১A ধারা) পুলিশি নোটিস WhatsApp বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক উপায়ে দেওয়া যাবে না, আর রাজ্যগুলোকে স্ট্যান্ডিং অর্ডার জারি করতে বলে। ২০২৫-এর জুলাইয়ে ইলেকট্রনিক উপায়ে নোটিস দেওয়ার অনুমতি চেয়ে হরিয়ানার আবেদন আদালত খারিজ করে, কারণ এতে মানুষের স্বাধীনতার প্রশ্ন জড়িত।
- সুপ্রিম কোর্ট নিজেই প্রতারণাটা নিয়ে মামলা শুরু করে। ২০২৫-এর অক্টোবরে আম্বালার এক বয়স্ক দম্পতি জাল আদালত ও ED-র আদেশ দেখানো প্রতারকদের হাতে ₹১ কোটির বেশি খোয়ানোর পরে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত মামলা শুরু করে। মামলার নাম In Re: Victims of Digital Arrest Related to Forged Documents।
- সারা দেশে CBI তদন্ত। ১ ডিসেম্বর ২০২৫ আদালত CBI-কে সবার আগে ডিজিটাল অ্যারেস্টের মামলাগুলোর তদন্ত করতে বলে, মিউল অ্যাকাউন্টে ব্যাংক কর্মীদের ভূমিকা সমেত, আর রাজ্যগুলোকে সম্মতি দিতে বলে।
- ৪ আগস্ট ২০২৬-এর অন্তর্বর্তী নির্দেশ। SCC Online-এর খবর অনুযায়ী, আদালত RBI-কে মিউল অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত টাকা সাময়িকভাবে আটকে রাখার একটা পদ্ধতি চালু করতে বলেছে, রাজ্যগুলোকে সরকারের টাকা ফেরত আর অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালু করতে বলেছে, আর একটা কমিটিকে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের কাঠামো বিবেচনা করতে বলেছে। সেই কাঠামো এখনও বিবেচনাধীন, চালু হয়নি।
- প্রতারণার হাতিয়ারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা। ২০২৫-এর মার্চে সরকার জানায়, ডিজিটাল অ্যারেস্টে ব্যবহৃত ৩,৯৬২-র বেশি Skype ID আর ৮৩,৬৬৮টা WhatsApp অ্যাকাউন্ট I4C ব্লক করেছে, আর ভারতীয় নম্বর নকল করে আসা আন্তর্জাতিক কল টেলিকম অপারেটররা আটকাচ্ছে।
একটি কাল্পনিক উদাহরণ
বাবা-মাকে সুরক্ষিত রাখুন
- আজই সহজ কথায় বলুন: “কোনো পুলিশ অফিসার কখনও ভিডিও কলে তোমাকে গ্রেফতার করবে না। কেউ এমন বললে ফোন রেখে আমাকে ফোন কোরো।”
- ঠিক করে নিন, বড় অঙ্কের টাকা সরানোর যে-কোনো অনুরোধে আগে পরিবারের কাউকে ফোন করা হবে, কলার যা-ই বলুক।
- ফোনের পাশে একটা কার্ডে ১৯৩০ আর আপনার নিজের নম্বর লিখে রাখুন।
- কীভাবে নম্বর ব্লক ও রিপোর্ট করতে হয়, আর ভিডিও কল কাটতে হয়, দেখিয়ে দিন।
ব্যাংক কর্মীদের জন্য: কাউন্টারে যে লক্ষণ দেখবেন
- কোনো বয়স্ক গ্রাহক ফোনে কথা বলতে বলতে তাড়াহুড়ো করে ডিপোজিট ভাঙতে বা অচেনা অ্যাকাউন্টে বড় অঙ্ক পাঠাতে চাইছেন।
- গ্রাহক বলছেন টাকাটা “যাচাইয়ের জন্য”, “আদালতের জন্য” বা “নাম পরিষ্কার করার জন্য”, বা তাঁকে কারণ বলতে নিষেধ করা হয়েছে।
- গ্রাহক ভয় পেয়ে আছেন, কলারের নির্দেশ মেনে চলছেন, বা প্রাপকের তথ্য আপনাকে দেখাতে চাইছেন না।
- শান্তভাবে খোলা প্রশ্ন করুন, গ্রাহককে সময় দিন। শাখা প্রবন্ধককে ডাকুন, পরিবারের কাউকে ফোন করার প্রস্তাব দিন, আর প্রতারণা মনে হলে গ্রাহককে ১৯৩০-এ ফোন করতে সাহায্য করুন।
- যা দেখলেন, লিখে রাখুন। পরে প্রতারণার অভিযোগ হলে সময় আর খুঁটিনাটি কাজে লাগে।
প্রশ্ন ও উত্তর
ভারতে কি ডিজিটাল অ্যারেস্ট আইনসম্মত?
না। ভারতের আইনে ডিজিটাল অ্যারেস্ট নামে কোনো প্রক্রিয়া নেই। পুলিশ ভিডিও কলে কাউকে গ্রেফতার করে না, ক্যামেরার সামনে আটকে রাখে না, আর নির্দোষ প্রমাণের জন্য টাকা পাঠাতে কখনও বলে না।
পুলিশ কি WhatsApp-এ নোটিস পাঠাতে পারে?
BNSS-এর ৩৫ ধারায় হাজিরার নোটিস নয়। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, এই নোটিস WhatsApp বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক উপায়ে দেওয়া যায় না; আইনে যেভাবে বলা আছে, সেভাবেই দিতে হবে।
ডিজিটাল অ্যারেস্ট কলের মধ্যে কী করব?
কল কেটে দিন। টাকা দেবেন না, OTP বা ব্যাংকের তথ্য দেবেন না, কোনো অ্যাপ ইনস্টল করবেন না। পরিবারের কাউকে জানান, তারপর ১৯৩০-এ ফোন করুন বা cybercrime.gov.in-এ অভিযোগ করুন। নম্বরটা সঞ্চার সাথীর Chakshu পাতায় জানাতে পারেন।
ডিজিটাল অ্যারেস্ট প্রতারণায় টাকা দিয়ে ফেলেছি। ফেরত পাব?
এখনই ১৯৩০-এ, আপনার ব্যাংকে আর cybercrime.gov.in-এ জানান। তাড়াতাড়ি জানালে অনেক সময় যে অ্যাকাউন্টে টাকা গেছে সেখানেই আটকে দেওয়া যায়। ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে হওয়া প্রতারণায় ছোট অঙ্কের ক্ষতির জন্য RBI-এর এককালীন ক্ষতিপূরণ মিলতে পারে, হুমকির মুখে দেওয়া পেমেন্টেও।
ডিজিটাল অ্যারেস্ট প্রতারণার তদন্ত কারা করছে?
অভিযোগ দেখে রাজ্য পুলিশ। এ ছাড়া ২০২৫-এর ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট সারা দেশের ডিজিটাল অ্যারেস্ট মামলার তদন্ত করতে CBI-কে বলেছে, মিউল অ্যাকাউন্টে ব্যাংক কর্মীদের ভূমিকা সমেত।
ভিডিও কলের অফিসাররা কি আসল?
না। সরকারের সতর্কবার্তা বলছে, প্রতারকেরা থানা আর সরকারি অফিসের মতো সাজানো স্টুডিও ব্যবহার করে, আর আসল মনে হওয়ার জন্য উর্দি পরে।
তথ্যের সূত্র
এটি সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। বিনামূল্যে আইনি পরামর্শের জন্য জাতীয় আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের (NALSA) হেল্পলাইন ১৫১০০-এ ফোন করুন। এখানকার তথ্য নেওয়া হয়েছে এই সূত্রগুলো থেকে:
- Press Information Bureau (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক), ১৪ মে ২০২৪: পুলিশ, NCB, CBI, RBI ও অন্য সংস্থা সেজে সাইবার অপরাধীদের ব্ল্যাকমেল ও “ডিজিটাল অ্যারেস্ট” নিয়ে সতর্কবার্তা।
- Press Information Bureau (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক), ১২ মার্চ ২০২৫: ডিজিটাল অ্যারেস্ট প্রতারণা রুখতে নেওয়া পদক্ষেপ: ব্লক করা Skype ID ও WhatsApp অ্যাকাউন্ট, নকল আন্তর্জাতিক কল, ১৯৩০ আর cybercrime.gov.in।
- SCC Online, ৩১ জুলাই ২০২৫: BNSS-এর ৩৫ ধারার নোটিস সশরীরে দিতে হবে, WhatsApp-এ নয় (Satender Kumar Antil v. CBI)।
- The Tribune, ১ ডিসেম্বর ২০২৫: সারা দেশের ডিজিটাল অ্যারেস্ট মামলায় সুপ্রিম কোর্টের CBI তদন্তের নির্দেশ।
- SCC Online, ১০ আগস্ট ২০২৬: ডিজিটাল অ্যারেস্ট প্রতারণা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশ (৪ আগস্ট ২০২৬-এর আদেশ)।
- RBI/2026-27/167, ২৪ জুন ২০২৬: ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে পাঁচ দিনের সময় আর ছোট অঙ্কের ক্ষতিপূরণ।
- cybercrime.gov.in আর ১৯৩০ হেল্পলাইন; সঞ্চার সাথী (Chakshu); জাতীয় আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ (১৫১০০)।
নিয়ম ও আদালতের নির্দেশ বদলায়। কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে cybercrime.gov.in, rbi.org.in বা আপনার ব্যাংকে বর্তমান অবস্থা মিলিয়ে নিন।